>>>>>>>ধুলো জমা স্মৃতির শহর<<<<<<
১
ঢাকার পুরনো গলির ভেতর অয়নদের পৈতৃক বাড়িটা যেন সময়ের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নোনা ধরা দেওয়াল আর শ্যাওলা পড়া ছাদ—সব মিলিয়ে এক ভুতুড়ে নির্জনতা। অয়ন একজন আধুনিক মননসম্পন্ন স্থপতি, যে গত দশ বছর ধরে দেশের বাইরে ছিল। দাদুর মৃত্যুর খবর তাকে আবার এই পুরনো শহরে ফিরিয়ে এনেছে। দাদু ছিলেন এক রহস্যময় মানুষ, যিনি শেষ জীবনে প্রায় কথা বলাই বন্ধ করে দিয়েছিলেন।
উইলে লেখা ছিল, "চিলেকোঠার ওই মরচে পড়া ট্রাঙ্কটা যেন শুধু অয়নই খোলে।" অয়ন যখন সেই ধুলোমাখা ঘরের তালা ভাঙল, তখন ঘরের ভেতর এক অদ্ভুত পুরোনো ওষুধের গন্ধ নাকে এল। ট্রাঙ্কের ভেতর কোনো সোনা বা হিরে নেই; আছে কেবল স্তূপাকার নীল খাম। প্রতিটি খামের ওপর তারিখ লেখা—১৯৫০ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত। আর নিচে পড়ে আছে একটি কালো রঙের ক্যাসেট প্লেয়ার।
২. এক কণ্ঠস্বরের জাদুকরী মায়া
অয়ন কৌতূহলী হয়ে ক্যাসেটটি প্লেয়ারে ঢোকাল। ফিতা ঘুরতে শুরু করার সাথে সাথে একটি গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এল। কণ্ঠটি তার বাবার, যাকে অয়ন মাত্র পাঁচ বছর বয়সে এক রহস্যময় গাড়ি দুর্ঘটনায় হারিয়েছিল।
বাবার কণ্ঠস্বর বলছে:
"অয়ন, যদি তুই এই কথাগুলো শুনছিস, তার মানে আমি আর বেঁচে নেই। আমাদের পরিবার একটা মস্ত বড় মিথ্যার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। দাদু যে সম্পদ আগলে রেখেছেন, তা আসলে আমাদের নয়। সুন্দরবনের কাছাকাছি 'মায়ানগর' গ্রামে আমাদের একটা পুরনো বাগানবাড়ি আছে। সেখানে একটা নীল ডায়েরি লুকানো আছে, যা তোকে সব সত্যি বলে দেবে। সাবধান অয়ন, এই সম্পদ পাওয়ার জন্য আমাদের চারপাশেই অনেক শত্রু ওৎ পেতে আছে।"
অয়ন অবাক হয়ে দেখল, প্রতিটি নীল খামের ভেতর একটি করে হাতে আঁকা মানচিত্রের টুকরো। প্রতিটি খাম যেন এক একটি ধাঁধা। সে যখন খামগুলো মেঝেতে সাজাচ্ছিল, তখন হঠাৎ অনুভব করল বাইরের জানালার শার্শিতে কেউ একজন কড়া নাড়ল। অয়ন দ্রুত জানালা খুলল, কিন্তু কাউকে দেখতে পেল না। শুধু দেখতে পেল বাগানে মাটির ওপর বড় বড় পায়ের ছাপ।
৩. মায়ানগরের পথে যাত্রা
পরদিন সকালেই অয়ন মানচিত্র আর ক্যাসেট প্লেয়ারটি ব্যাগে ভরে রওনা দিল মায়ানগরের উদ্দেশ্যে। সুন্দরবনের গহিনে এই গ্রামটি বাইরের জগত থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন। সেখানে পৌঁছে তার দেখা হলো মায়ার সাথে। মায়া একজন চটপটে তরুণী, যে স্থানীয় লোকগাথা ও ইতিহাস নিয়ে কাজ করে।
মায়া অয়নকে সতর্ক করে বলল, "আপনি যে বাগানবাড়ির কথা বলছেন, সেটাকে গ্রামের মানুষ 'অভিশপ্ত নীল বাড়ি' বলে ডাকে। ১৯৫২ সালে সেখানে এক ব্রিটিশ প্রত্নতাত্ত্বিক কিছু দুষ্প্রাপ্য মূর্তি লুকিয়ে রেখেছিলেন। তারপর থেকে যারাই সেই মূর্তির খোঁজে গেছে, তারা কেউ সুস্থ অবস্থায় ফেরেনি।"
অয়ন আর মায়া মিলে জঙ্গলের পথ দিয়ে এগোতে লাগল। বনের ভেতর এক জায়গায় তারা দেখল অদ্ভুত সব নীল ফুল ফুটে আছে। মায়া অবাক হয়ে বলল, "এই ফুলগুলো তো কেবল গভীর রাতে ফোটার কথা, এখন কেন ফুটল?" অয়ন মানচিত্রের টুকরোগুলো মিলিয়ে দেখল, তারা সঠিক পথেই আছে।
৪. অন্ধকারের মুখোশধারী
বাগানবাড়িতে পৌঁছানোর পর তারা দেখল বিশাল এক লোহার ফটক। বাড়িটা যেন এক প্রাচীন প্রাসাদের মতো রাজকীয় কিন্তু জীর্ণ। ভেতরে প্রবেশ করতেই অয়ন দেখতে পেল দেওয়ালে বিশাল এক তৈলচিত্র। সেখানে তার দাদুর সাথে আরও একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন, যার চেহারা হুবহু অয়নের মতো।
হঠাৎ অন্ধকার থেকে একটি কণ্ঠস্বর ভেসে এল, "স্বাগত অয়ন! আমি জানতাম তুমি ঠিকই এখানে আসবে।" সামনে বেরিয়ে এল সুমিত কাকা। সুমিত কাকা অয়নের বাবার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন, কিন্তু তার চোখে এখন খুনের নেশা।
সুমিত কাকা গর্জে উঠল, "ওই মানচিত্রের শেষ টুকরোটা আমাকে দাও! ওখানেই লেখা আছে সেই গুপ্ত কক্ষের হদিস, যেখানে কোটি টাকার প্রত্নতাত্ত্বিক মূর্তিগুলো রাখা আছে। তোমার বাবা আর দাদু এই সম্পদ লুকিয়ে রেখেছিলেন সমাজসেবার নামে, কিন্তু আমি তা হতে দেব না!"
৫. চূড়ান্ত রহস্যভেদী লড়াই
সুমিত কাকার হাতে ছিল একটি রিভলভার। অয়ন বুঝতে পারল, তার বাবা ক্যাসেটে যে অভিশাপের কথা বলেছিলেন, তা আসলে মানুষের লোভ। ক্যাসেটের শেষ অংশটি অয়ন গোপনে প্লে করল। বাবার কণ্ঠ এবার আরও স্পষ্ট:
"অয়ন, নীল ডায়েরিটা আসলে কোনো গুপ্তধনের চাবি নয়। ওটা হলো এক স্বীকারোক্তি। আমাদের পূর্বপুরুষরা ওই মূর্তিগুলো চুরি হতে দেননি, বরং তারা সেগুলোকে রক্ষা করতে গিয়ে নিজেদের জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন।"
অয়ন বুদ্ধি করে সুমিত কাকাকে বলল, "কাকা, গুপ্তধনের চাবি ওই বড় ঝাড়বাতির ভেতর লুকানো আছে।" সুমিত যেই লোভে সেদিকে তাকাল, মায়া পেছন থেকে একটি পুরনো ভারী মূর্তির বেদি দিয়ে তাকে আঘাত করল। ধস্তাধস্তির মাঝেই পুলিশ নিয়ে মায়ার সহকর্মীরা সেখানে হাজির হলো। মায়া আসলে কোনো সাধারণ সাংবাদিক ছিল না, সে ছিল সাদা পোশাকের গোয়েন্দা পুলিশ।
৬. সত্যের আলোয় ফেরা
সুমিত কাকা গ্রেপ্তার হওয়ার পর অয়ন সেই লুকানো নীল ডায়েরিটি খুঁজে পেল। ডায়েরি থেকে জানা গেল, তার দাদু আসলে সেই ব্রিটিশ অফিসারের বন্ধু ছিলেন এবং তারা মিলে এই প্রাচীন ইতিহাসকে চোরদের হাত থেকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন। কোনো গুপ্তধন নয়, বরং দেশের সম্পদ রক্ষার জন্যই তারা এত বছর সব কিছু গোপন রেখেছিলেন।
অয়ন বাড়িটা সরকারকে দান করার সিদ্ধান্ত নিল। সে সেখানে একটি জাদুঘর গড়ে তোলার প্রস্তাব দিল। কাজ শেষ করে যখন সে ঢাকার পথে ফিরছে, তখন সে আবার সেই ক্যাসেটটি প্লে করল। এবার শেষ বাক্যটি ভেসে এল:
"শান্তিতে থেকো অয়ন। সম্পদ মানুষকে একা করে দেয়, কিন্তু সত্য মানুষকে মুক্তি দেয়।"
অয়ন জানালার বাইরে তাকাল। বনের সেই নীল ফুলগুলো এখন যেন বাতাসের দোলায় তাকে অভিবাদন জানাচ্ছে। তার মনের ভেতর এখন আর কোনো রহস্যের ধোঁয়াশা নেই, আছে শুধু এক অদ্ভুত শান্তি।
✨ কুইজ
সঠিক উত্তরটি লিখুন
প্রশ্ন: গল্পের সেই প্রত্নতত্ত্ববিদের নাম কী?
⚠️ কাজের নিয়ম:
নিচের কুইজটি সঠিকভাবে পূরণ করুন এবং "কাজ সম্পন্ন" লেখা আসার পর স্ক্রিনশট নিয়ে অ্যাপে জমা দিন। অন্যথায় পেমেন্ট পাওয়া যাবে না।
😶⚠️⚠️

0 Comments